স্টাফ রিপোর্টার | গাইবান্ধা
গাইবান্ধা জেলা পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক উপপরিদর্শকের (এসআই) স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে— জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) নিশাত এ্যাঞ্জেলা, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুর ইসলাম তালুকদারসহ তিনজন কর্মকর্তা ও আরও অজ্ঞাত তিনজন জোরপূর্বকভাবে ওই এসআইয়ের ব্যক্তিগত মোবাইল, ল্যাপটপ ও নগদ অর্থ আটকে রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন।
অভিযোগের সূত্রপাত
তথ্য বলছে, এসআই মনিরুজ্জামান তখন গাইবান্ধা সদর থানায় কর্মরত ছিলেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, মনিরুজ্জামানের এক আত্মীয় তারেকুজ্জামান তুহিন পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে তার বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ দেন জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে।
এরপর চলতি বছরের ২৫ মার্চ, এসপি নিশাত এ্যাঞ্জেলা ও ওসি শাহিনুর ইসলাম তালুকদার এসআই মনিরুজ্জামানকে সদর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান।
সূত্র জানায়, এসপি অফিসে প্রবেশ করার পর সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ধ্রুব জ্যোর্তিময় গোপ তার কাছ থেকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নগদ ১৩ হাজার টাকা জোরপূর্বক কেড়ে নেন এবং সেগুলো সদর থানার ওসির কাছে জমা রাখেন।
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটির পর মনিরুজ্জামানকে ভয় দেখিয়ে বলা হয়— বিষয়টি বাহিরে প্রকাশ পেলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি, ‘ভাড়াটিয়া গুণ্ডা দিয়ে গুম করে ফেলা হবে’ বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ
বাদী কাজলী খাতুন আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন—
“আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেননি। তাকে অন্যায়ভাবে হেনস্তা ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য চাইলে কেউ সহযোগিতা করেননি। বরং তাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজশাহী রেঞ্জে বদলি করে দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আমার স্বামী এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছি কারণ প্রশাসনের ভেতর থেকে কোনো ন্যায় বিচার পাইনি।”
আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের নির্দেশনা
বুধবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে গাইবান্ধা সদর আমলী আদালতের বিচারক জাহাঙ্গীর আলম মামলাটি গ্রহণ করেন।
আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“আদালত প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পিবিআই (Police Bureau of Investigation)-কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।”
প্রশ্ন উঠছে: পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা কোথায়?
ঘটনাটিকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে মানবাধিকার সংস্থা আসক (ASK)-এর এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন,
“যদি সত্য হয় যে একজন এসআইয়ের কাছ থেকে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জোরপূর্বক ডিভাইস ও অর্থ নিয়েছেন— তাহলে এটি ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার। এ ধরনের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রক্রিয়া কোথায় কাজ করছে, সেটিই এখন প্রশ্ন।”
অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
এসপি ও ওসির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ। বিষয়টি পিবিআই যাচাই করবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তথ্য বলছে: পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা বাড়ছে
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে ৩২৭টি মামলায় ৪৮৫ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
তুলনামূলকভাবে, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৮৭। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
অধিকাংশ মামলাই তদন্ত প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে নিষ্পত্তিহীন থেকে যাচ্ছে বলে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত: প্রশাসনে “ভয়ের সংস্কৃতি” বাড়ছে
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি আব্দুস সামাদ বলেন,
“এই ধরনের ঘটনা প্রশাসনের ভেতরে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। নিচের কর্মকর্তারা যদি নিজের অধিকার রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে নাগরিকদের নিরাপত্তা কে দেবে?”
তিনি আরও বলেন,
“পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং অভিযুক্তরা দোষী প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক নয়, ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।”
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক প্রতিধ্বনি
গাইবান্ধা জেলা শহরে মামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
সদর থানার সামনে এক দোকানদার বলেন,
“এসআইদেরও যদি এমনভাবে হেনস্তা করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এখন নজর পিবিআইয়ের তদন্তের দিকে। আদালতের নির্দেশে তদন্তে নতুন তথ্য উঠে আসলে, এটি বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে— বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
অভিযোগ উঠছে— ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ভীতি ও হুমকির সংস্কৃতি এখন প্রশাসনের ভেতরেই বিস্তার লাভ করছে।
তথ্য বলছে— পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র জানায়— গাইবান্ধার এই মামলা শুধুমাত্র একজন এসআইয়ের নয়, এটি সমগ্র ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।