
নিজস্ব প্রতিবেদক |
প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ—মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নিয়োগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে রাজধানীর সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত।
অভিযোগ উঠছে, “চুক্তিভিত্তিক” পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা প্রশাসনের নিয়ম, ন্যায্যতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থ রক্ষা করছেন।
এ ঘটনায় সিনিয়র সচিব সামসুল আলমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা মন্তব্য প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে অস্বচ্ছতা — প্রশ্ন উঠছে ন্যায়বিচার নিয়ে
তথ্য বলছে, বিসিএস নবম ব্যাচের সিনিয়র সচিব সামসুল আলম দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছিল।
প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনও পাওয়া যায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। কিন্তু সূত্র জানায়, সেই ফাইলটি এখনো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে “বন্দি” অবস্থায় রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—
যদি প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন থাকে, তবে কেন তা কার্যকর করা হচ্ছে না? কারা এই প্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন? এবং কেন প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো এখন আর সরকারের নীতিগত নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়?
অভিযোগ উঠছে, কিছু অবসরপ্রাপ্ত প্রভাবশালী আমলা, যারা অতীত সরকারে প্রভাবশালী ছিলেন, তারা সচিবালয়ের অভ্যন্তরে এখনো সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। সিনিয়র সচিব সামসুল আলম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদিত ফাইল সচিবালয়ের একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপ শুধু প্রশাসনের অপমান নয়, এটি ন্যায়ের প্রতি চ্যালেঞ্জ।
জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রত্যাশা
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের “জুলাই আন্দোলন”-এর পর প্রশাসনের ভেতরে একটি সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়।
বিগত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিলেন,
তাদের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নতুন নেতৃত্ব আসবে — এই ছিল সাধারণ ধারণা।
কিন্তু অভিযোগ উঠছে, বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টোটি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক বছরে প্রশাসনের শীর্ষ পদে
বিগত সরকারের আমলের অন্তত দুই ডজন সচিব বহাল আছেন। এদের অনেকের নিয়োগই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
অভ্যন্তরীণ নথি ও সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ”-এর মাধ্যমে এই পদগুলো বর্ধিত করা হচ্ছে,
যা প্রচলিত সরকারি চাকরি বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন প্রশাসনের জন্য আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগ্যরা বঞ্চিত, প্রভাবশালীরা পুরস্কৃত।
শেখ আব্দুর রশিদের চুক্তি ঘিরে বিতর্ক
বিগত সরকারের সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব ছিলেন
বিসিএস ৮২ ব্যাচের ড. শেখ আব্দুর রশিদ।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দুই মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে “বিশেষ রাজনৈতিক অনুকম্পায়” সেই মেয়াদ বাড়িয়ে আরও দশ মাস করা হয়।
এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে সামসুল আলমের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে।
তিনি লিখেছেন, “দুই মাসের জন্য নিয়োগ পাওয়া এক কর্মকর্তা এখন প্রায় এক বছর ধরে পদে রয়েছেন।
এটি প্রশাসনের জন্য অপমানজনক এবং অনৈতিক।”
প্রশ্ন উঠছে,
একই প্রশাসনে একদিকে যদি ‘চুক্তিভিত্তিক’ নামে মেয়াদ বর্ধিত করা হয়,
আর অন্যদিকে যোগ্য কর্মকর্তার ফাইল আটকে রাখা হয়,
তবে যোগ্যতার মূল্য কোথায়?
জনপ্রশাসনে অদৃশ্য প্রভাবের অভিযোগ
তথ্য বলছে, সামসুল আলমের অভিযোগের পর সচিবালয়ে নীরব তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে তার মন্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর অনেক কর্মকর্তাই নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন
অফ-দ্য-রেকর্ড আলোচনায়।
একজন যুগ্মসচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
আমরা সবাই জানি কারা ফাইল আটকে রেখেছেন।
তবে এখন মুখ খুললে বদলি, পদোন্নতি বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হয়।
অন্যদিকে, সাবেক সচিব মোখলেসুর রহমানের বিরুদ্ধেও সামসুল আলম অভিযোগ করেছেন
দুর্নীতি, পক্ষপাত ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভাঙার বিষয়ে।
তার ভাষায়, “এসএসবি এখন যোগ্যদের নয়, দুর্নীতিবাজদের পদোন্নতির যন্ত্র।”
বিশ্লেষকরা বলছেন,
এই মন্তব্য কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং প্রশাসনের গভীরে থাকা এক সাংগঠনিক অসুস্থতার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: প্রশাসন ‘মেধা থেকে প্রভাবের দিকে’ জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. খন্দকার রাশেদুল ইসলাম মনে করেন, এই ধরণের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে প্রশাসনে জবাবদিহিতা কমে যাচ্ছে।
যিনি চুক্তিতে আছেন, তিনি জানেন—তার পদ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুগ্রহে টিকে আছে।
এমন পরিবেশে পেশাদারিত্ব বা ন্যায্যতা আশা করা কঠিন।
পরিসংখ্যান বলছে,
গত তিন বছরে প্রশাসনের ২৬ শতাংশ শীর্ষপদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত ৪২ শতাংশ নিয়োগে রাজনৈতিক সংযোগ বা সুপারিশের প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের এক সূত্র জানায়, এই চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার আড়ালে প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে একটি অদৃশ্য গোষ্ঠীর হাতে। জুলাই আন্দোলনের প্রবর্তক আমলারা ‘বঞ্চিত’
সামসুল আলমসহ বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন,
যারা জুলাই আন্দোলনের সময় প্রশাসনিক ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতার জন্য লড়াই করেছিলেন,
তাদের এখন প্রশাসন থেকে দূরে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাই পুনরায় নিয়োগ বা প্রভাবশালী পদে রয়েছেন।
একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন,
“যারা বছরের পর বছর নিরপেক্ষ থেকে কাজ করেছেন,
তাদের এখন অবসর বা অপেক্ষায় পাঠানো হচ্ছে।
এটি প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।
জনগণের প্রশাসন নাকি গোষ্ঠীর? — প্রশ্ন উঠছে ন্যায্যতার ভিত্তিতে
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি এখন কেবল একজন সচিবের পদোন্নতির প্রশ্ন নয়,
এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য, নৈতিকতা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও কেন সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না,
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সরকারের দায়িত্বশীল এক সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি আলোচনায় আছে। তবে ফাইলটি প্রকাশের আগে কিছু প্রশাসনিক যাচাই চলছে। তবে অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু “সময়ক্ষেপণের কৌশল”।
অবসরে যাওয়া সচিবদের প্রভাব: প্রশাসনের অভ্যন্তরে ‘ছায়া সরকার’?
তথ্য বলছে, গত এক বছরে অন্তত সাতজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব এখনো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণে প্রভাব রাখছেন। তাদের কেউ উপদেষ্টা, কেউ বিশেষ প্রতিনিধি বা চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন।
এই অবস্থাকে অনেকেই প্রশাসনের “ছায়া সরকার” বলে বর্ণনা করছেন।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন,
যখন একজন কর্মকর্তা অবসরের পরও সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখেন,
তখন নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তারা উদ্যোগ হারান।
এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি ধ্বংস করছে।”
প্রধান উপদেষ্টার সামনে ‘অন্তঃসারশূন্য নথি’?
সূত্র জানায়, প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদিত ফাইলটি জনপ্রশাসনে আটকে যাওয়ার পর
তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিয়েছেন।
তবে এখনও কোনো প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি হয়নি।
এখন প্রশ্ন উঠছে—প্রধান উপদেষ্টা কি জানেন তার অনুমোদিত ফাইল মাঠে বাস্তবায়িত হচ্ছে না?
নাকি তার কাছেও পৌঁছানো তথ্যের মধ্যে ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলো প্রশাসনের অভ্যন্তরে এখন সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু।
প্রশাসনের আস্থা পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি দ্রুত এই অচলাবস্থা দূর না হয়,
তাহলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে বিরক্তি ও ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।
যে প্রশাসন একসময় আন্দোলনের মাধ্যমে “স্বাধীনতা ও ন্যায্যতার প্রতীক” হয়ে উঠেছিল,
তা এখন পরিণত হচ্ছে “চুক্তি ও প্রভাবের কারখানায়”।
প্রশ্ন উঠছে —
প্রশাসন এখন কাদের হাতে?
মেধা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতার জায়গায় কি বসেছে ক্ষমতার প্রভাব?
উত্তর খুঁজছে দেশ।